সারাদিনের খাটুনির পরও গৃহিণী কিছু করেন না

Advertisement

ডয়েচে ভেলে: গৃহিণীরা সারাদিন কী করেন? প্রশ্ন উঠতেই পারে৷ উত্তরে যদি বলা হয়, তাঁরা কেবল টেলিভিশন সিরিয়াল দেখে সময় কাটান, তাহলে একে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের রটনা’ ছাড়া আর কী বলা যায়? গৃহিণীদের কাজের কি কোনো স্বীকৃতি নেই?

Advertisement

এক শিশুকে অভিভাবক প্রস্তুত করেছেন স্কুলে ভর্তির জন্য৷ ভর্তির আগে স্কুলের নিয়মানুযায়ী মৌখিক পরীক্ষা৷ তার নাম, বাবা মায়ের নাম, বাসার ঠিকানা, বাবার চাকুরি, জাতীয় ফুল ফল পাখির নাম, আরও নানাকিছু শিখতে শিখতে নির্ধারিত দিনে শিশুটি বাবা মায়ের সাথে স্কুলের শিক্ষকদের সামনে পৌছে গেল৷ চলছে মৌখিক পরীক্ষা৷ বাবা কী করেন জিজ্ঞেস করতে শিশুটি জানায় বাবা অফিসে যান৷ আর মা কী করেন? এবার নিরুত্তর শিশু একবার বাবার দিকে একবার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে উত্তর খোঁজে৷ মা আসলে কী করে? শিশুটির প্রশ্নবোধক চোখ শিক্ষকদের দিকেও পড়ে৷ এক শিক্ষক বুঝতে পেরে বলেন, ও আচ্ছা, কোনো সমস্যা নেই বাবু, বল বাবা অফিসে যায় মা কিছু করেন না, বাসায় থাকে৷

শিশুটির স্কুলে ভর্তির অনুমতি মেলে বটে, কিন্তু একটি ভুল শিক্ষার মধ্য দিয়ে হাতে খড়ি হয়: মা বাসায় থাকে, কিছু করে না৷ মায়ের সারাদিনের কাজ যে ‘কিছু না করা’ এবং কেবল অফিসে গেলেই সেটা যে কাজ করা’ হয়, সেটা শেখার মধ্য দিয়ে শিক্ষা জীবন শুরু করে শিশুটি৷

সাদা চোখে এটাই দেখা যায়৷ কিন্তু এর বাইরে গৃহিণীর কি অন্য জীবন নেই? আছে৷

বেসরকারি ব্যাংক কর্মকর্তার জীবনসঙ্গী নাহিয়ান কাদির৷ এগারো বছরের সংসার জীবনে একমাত্র সন্তান দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে৷ নাহিয়ান রোজ ভোরে ৬টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পরিবারের বাকি দুই সদস্য ও শশুরবাড়ির তত্ত্বাবধানে ব্যস্ত থাকেন৷ সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা তৈরি করা, সন্তানকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত করা, স্বামীর লাঞ্চবক্স তৈরি করে সন্তানকে স্কুলে পৌছে দিতে বের হয়ে যান তিনি৷ স্কুলে নামিয়ে দিয়ে বাসায় ফিরে এসেই সহযাত্রী হন স্বামীর অফিস প্রস্তুতির৷ এরপর ছেলেকে নিয়ে আসেন স্কুল থেকে, নিজে গাড়ি চালিয়ে৷

এ সবের মধ্যে পাশের পাড়ায় বসবাসকারী শাশুড়িকে ফোন করে জেনে নেন বাসায় কিছু লাগবে কিনা, ঠিক মতো সকালের খাবার খেয়েছেন কিনা৷ মা-ছেলেতে একসাথে দুপুরের খাওয়া শেষ করে টেলিভিশনে কিছু একটা ছেড়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেন৷ উঠে আবারও স্কুল থেকে দেওয়া হোমওয়ার্ক, বিকেলের গরম গরম নাস্তা তৈরি, ছেলেকে নিয়ে শাশুড়ির বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসা ও খোঁজখবর নেওয়া৷ বাসায় ততক্ষণে স্বামী ফিরে এসেছেন৷ তাই রাতের রান্না জোগাড় করতে হয়৷ এরপর খাওয়া দাওয়া আর পরের দিন কী রাধবেন, তা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বিছানায় যাওয়া৷ সারাদিন ১৬-১৭ ঘণ্টা কাজ করেন তিনি, কিন্তু সেই কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন না থাকায় সেটা কাজ হিসেবে বিবেচনা হয় না৷ বাসায় থাকলে এ সব কাজ তো করতেই হয় এবং অবধারিতভাবে সেই দায়িত্ব নিতে হয় নারীকেই, অন্তত আমাদের সমাজে৷

নারীর গৃহস্থালির কাজকে শ্রমের আওতায় আনার দাবি আজকে নতুন নয়৷ এখন যখন কিনা নারী অনেক বেশি নিজের অবস্থান নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে এবং অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ছাড়া যখন সেটিকে কাজ এর মর্যদা দেওয়া হচ্ছে না, তখন নারী অধিকারকর্মীরা নিজেদের কাজটিকে শ্রম হিসেবে মুল্যায়নের পক্ষে মত দেন৷ কেননা আমাদের দেশের অধিকাংশ নারীই পারিবারিক শ্রমিক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে৷ বাংলাদেশের দু’টি জেলায় গবেষণা চালিয়ে অ্যাকশন এইড তাদের প্রতিবেদনে বলছে, অমূল্যায়িত সেবাখাতে পুরুষদের তুলনায় নারী অন্তত ৪০ভাগ সময় বেশি ব্যয় করেন৷ কিন্তু তাঁদের এই কাজের কোনো স্বীকৃতি নেই৷ বাসা-বাড়িতে কাজের সহযোগীতায় যে গৃহকর্মীরা থাকেন, তাঁরা কাজের জন্য নির্দিষ্ট অংকের মজুরি পান৷ কিন্তু একজন গৃহিণী কোনো মজুরি ছাড়াই সারাদিন কাজ করছেন এবং শুনছেন যে ‘তিনি কিছু করেন না’৷

ঘরের নারীর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই সন্তান ও স্বামী পারিবারিক ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেন নির্বিঘ্নে৷ যে শ্রমের বিনিময়ে একটি পরিবার এগিয়ে যায়, সেই শ্রমের কোনো সামাজিক ও আর্থিক মূল্যায়ন না হওয়াতে নারীর অধিকার অর্জনের পথ পরিবর্তিত হচ্ছে না৷ ফলে নতুন করে এই বিবেচনার দরকার আছে৷ আবার এ-ও ঠিক যে, শুধুমাত্র আইন ও নীতি পরিবর্তনের মাধ্যমে নারীর বাড়ির কাজের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি সম্ভব না৷ এরজন্য সমাজকে পরিবারকে এবং উপরন্তু গৃহিণীদেরও প্রস্তুত করার পদক্ষেপ হিসেবে আইন ও নীতি প্রস্তুত জরুরি৷

নারীবাদীরা অধিকার আন্দোলনে সবসময় যে বিষয়টি বলতে চান, তা হলো ঘরের কাজকে শ্রম হিসেবে বিবেচনা করা৷ চাকরিজীবী নারীরা সকালে অফিসের যাওয়ার আগে সংসারের কাজ করেন৷ তারপর অফিস করে বাসায় এসে আবারো নানা কাজ থাকে৷ গৃহিণী নারীর সংসারের কাজে সামান্য ভুল-ত্রুটিতেই শুনতে হয় ‘কী এমন করো’! এই যে রান্না-বান্না, সন্তান লালন-পালনসহ পরিবারের যত কাজ, এর সবই অবমূল্যায়িত খাত৷ কী এমন করোর উত্তর দেবে গবেষণা৷ একাধক প্রতিষ্ঠানের গবেষণা বলছে, একজন নারী পুরুষের চেয়ে বেশি কাজ করে, অথচ তাঁদের স্বীকৃতি কম৷ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বলছে, একজন নারী প্রতিদিন গড়ে ১২ দশমিক ১টি কাজ করেন৷ পুরুষদের ক্ষেত্রে এ কাজের গড় সংখ্যা ২ দশমিক ৭৷ জাতীয় আয়ে নারীর যে পরিমাণ কাজের স্বীকৃতি আছে, তার চেয়ে ২ দশমিক ৫ থেকে ২ দশমিক ৯ গুণ কাজের স্বীকৃতি নেই৷

যখনই নারীর তার ঘরের কাজের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে কথা তুলছে তখনই পালটা প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, নারীর ঘরের কাজের আবার অর্থনৈতিক মূল্য কী? একজন নারী প্রতিদিন গড়ে একজন পুরুষের তুলনায় প্রায় তিন গুণ সময় কাজ করেন, যা জাতীয় আয়ের হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয় না৷ গবেষণা বলছে, বাংলাদেশের নারীদের বার্ষিক মজুরিবিহীন গৃহকাজের অর্থনৈতিক মূল্য এক লাখ ১১ হাজার ৫৯১ দশমিক ৪৮ কোটি টাকা৷ বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘উন্নয়ন অন্বেষণ’ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে৷

এছাড়া অর্থনৈতিক দিক থেকে পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছেন যে নারীরা, তাঁদের আয় করা অর্থ কতটা তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্তে খরচ করতে পারেন, সেটা নিয়েও গবেষণা হচ্ছে, হওয়া উচুতও৷ সমাজ নারীকে প্রধান ভূমিকায় দেখতে চায় না বলেই কৃষিকাজে পুরুষদের কাজে ‘সহযোগিতা’ করেন নারীরা৷ তাঁরা কখনও কাজ করছেন চায়ের দোকানে, কখনো ফেরিওয়ালা হিসেবে, কখনো বা দোকানে স্বামী-সন্তানের ‘সহকারী’ হিসেবে৷ সবক্ষেত্রেই তিনি যেন ‘অদৃশ্য শ্রমিক’৷

বলতে দ্বিধা নেই যে, বাংলাদেশে বর্তমানে নারীরা ভিন্ন মাত্রায় বিভিন্ন কাজে নিজেকে নিয়োজিত করছেন৷ নানান প্রতিকূলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নিজেদের কথা বলার এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারের প্রশ্নে এই নারীরা নীরবে সংঘবদ্ধ হযচ্ছেন৷ কিন্তু কতটা এগিয়ে যেতে পেরেছি আমরা? সেই নব্বইয়ের দশকে ‘মুষ্ঠিচাল’ দিয়ে যে নারী তার অসময়ের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতো, সেটি হারাতে বসেছে৷ গ্রাম-বাংলার জনসমাজে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা নিজস্ব জ্ঞানকে সহায়ক পরিবেশের মাধ্যমে পরিচর্যা করলে নারীরা যে নিজেরাই বিকশিত হতে পারেন, তার অনন্য উদাহরণ এই ‘মুষ্ঠিচাল’৷ গ্রামীণ সমাজে প্রতিবেলার রান্নার চাল থেকে এক মুঠো তুলে রাখা এই চাল যে কোনো দুর্দিনের স্বজন-সন্তানের মুখে আহার তুলে দিতে সহায়ক৷ এই চাল তোলা এবং সেটা একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সামলানো সবই নারীকে সংগাঠনিকভাবে দক্ষ করে তোলে এবং দুঃসময়ে তাঁর এই অবদানই হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে জরুরি ত্রাণ৷

নারী কেবল সমাজের জন্য ত্রাতা হিসেবে উপস্থিত থাকবে, নারী কন্যা-জায়া-জননীর দায়িত্ব পালন করবেন – সমাজের এই চোখ বদলে দেওয়া জরুরি৷ নারীর জায়গা থেকে পরিবর্তনের কাজটা, লড়াইটা নারী শুরু করেছে যখন, তখন একইভাবে পুরুষের এগিয়ে আসাটা সময়ের দাবি৷ কেননা,নারীর লড়াই পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে৷

এ বিষয়ে আপনার কোনো মন্তব্য থাকলে লিখুন নীচে মন্তব্যের ঘরে৷