সেই যে কলম্বোতে নাগিন ড্যান্স দেখিয়ে আসা, ডাগআউটের সামনে এসে সাকিবের প্রতিবাদ করা, দুবাইয়ে ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত দিয়ে তামিমের লড়াই করা- সবকিছুতে কাঠির ডগায়ই বারুদ লেগে ছিল।

এবং প্রতিবারই তাতে আগুন জ্বালিয়েছিল টাইগাররা। আজ ব্রিস্টলেও কি তেমন কিছু হবে? ব্রিস্টলের উত্তাপ ছড়াবে কি এশিয়ার দুই নবপ্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে?

বৃষ্টি মাথায় প্রেসবক্সে বসে আর আজকের ওয়েদার বুলেটিন জেনে আগুনে ম্যাচকে যেন আগেই ভেজা মনে হচ্ছে! এখানে আজ সারাদিন বৃষ্টি হওয়ার আভাস রয়েছে, তেমন কিছু হলে পয়েন্ট ভাগাভাগিকেই সান্ত্বনা পুরস্কার হিসেবে মেনে নিতে হবে মাশরাফির।

কিন্তু সেটা হবে ম্যাচ হারার মতোই কোনো ব্যাপার। কেননা, বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল হিসেবে কড় গুনে যে ম্যাচগুলো ধরে রাখা হয়েছে, তাদের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে শ্রীলংকার ম্যাচ। এবং এই বিশ্বকাপে আজকের ম্যাচটিতেই প্রথমবারের মতো ফেভারিটের স্বীকৃতি নিয়ে নামছে টাইগাররা। সেখানে কার্টেল ওভারে লটারির মতো হিসাবও মেনে নিতে প্রস্তুত বাংলাদেশ, হার কোনোমতেই নয়।

বৃষ্টির এই পূর্বাভাসের পরও মাশরাফি যে পুরো ৫০ ওভার খেলার আশায় বুক বেঁধেছেন, তাতেও বড় ধাক্কা হয়ে এসেছে আজ সাকিবের খেলার অনিশ্চয়তা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলার সময়ই বাঁ উরুর পেশিতে টান লেগেছে তার। দু’দিনের বিশ্রামেও ব্যথা না কমায় সোমবার আক্রান্ত পেশির স্ক্যান করানো হয়েছে ব্রিস্টলে। পরে দলের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, বিশেষজ্ঞ ফিজিশিয়ানের পরামর্শ ও স্ক্যান রিপোর্ট পাওয়ার পরই জানা যাবে শ্রীলংকার বিপক্ষে সাকিব খেলতে পারবেন কি, পারবেন না।

বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার শেষ পর্যন্ত খেলেন বা না-ই খেলেন, জয়ের জন্য মাশরাফিরা যে মাঠে নিজেদের সর্বস্ব উজাড় করে দেবেন, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই। সাকিব না খেললে একাদশ নিয়ে নতুন ছকে ভাবতে হবে টিম ম্যানেজমেন্টকে। এমনিতেও এ ম্যাচে সাব্বির আর রুবেলকে নামানোর পরিকল্পনা মাথায় রেখেছেন তারা।

গতকালের টিম মিটিংয়েও এ কথাগুলোই জোরালোভাবে এসেছে। নিউজিল্যান্ডের কাছে ১৩৬ রানে অলআউট হওয়া, আফগানিস্তানের কাছে কোনোমতে বেঁচে ফেরা এবং পাকিস্তানের সঙ্গে বৃষ্টির বদান্যতায় এক পয়েন্ট পাওয়া- খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা এই লংকাকে কোনোভাবেই ‘সিংহ’ মনে হচ্ছে না।

কলম্বো থেকে আসা সাংবাদিককুলের কাছেও টাইগাররাই বরং এগিয়ে। ২০১৭ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত ওয়ানডেতে সাতবার দেখা হয় দু’দলের, যার মধ্যে একটি পরিত্যক্ত আর বাকিগুলো তিনটি করে জিতেছে দু’দল। পাল্লা সমান হলেও তামিম, সাকিব, মুশফিক, মাহমুদুল্লাহ আর মাশরাফির অভিজ্ঞতা এগিয়ে রাখছে বাংলাদেশকে।

সেদিন লংকান কোচ চন্ডিকাও কথায় কথায় বাংলাদেশের এই পঞ্চপাণ্ডবের কথা বলছিলেন। সেইসঙ্গে সৌম্য, মিরাজদেরও টেনে এনেছিলেন। দেড় বছর আগে বাংলাদেশের চাকরি ছাড়ার পর অনেকেই বলেছিল, হাথুরুর কাছে বাংলাদেশ দলের সাফল্যের রহস্য জানা আছে। কিন্তু সেটা ভুল প্রমাণ হয়েছিল নিদাহাস ট্রফি আর এশিয়া কাপের মতো বড় টুর্নামেন্টে।

তাই বিশ্বকাপেও ওই তত্ত্বটা ঠিক খাটছে না। বাংলাদেশের দুশ্চিন্তা বরং নিজেদের নিয়ে। তামিম তার ফর্মে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে আছেন। মাশরাফি কাল নিজেই স্বীকার করেছেন, প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছেন না। মাহমুদুল্লাহ রিয়াদও কেমন যেন বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন শেষ ওভারগুলোতে এসে।

শুধু সাকিব আর মুশফিক তাদের মতো খেলে যেতে পারছেন। গতকাল মাঠে এসেও তাই রিয়াদদের অনেকক্ষণ নেট করতে দেখা গেল। তবে সাকিব এদিন দলের সঙ্গে মাঠে এলেও অনুশীলন করেননি। অবশ্য এটা তার জন্য নতুন কিছু নয়। ম্যাচের আগে ঘেমেনেয়ে এনার্জি খরচ না করে তিনি বরং তা জমিয়ে রেখে দিয়েছেন। নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের কাছে পরপর ধাক্কা খাওয়ার পর একাদশে পরিবর্তন নিয়েও কথা উঠেছে।

মিডিয়ায় অবশ্য ফাঁস করেননি মাশরাফি তার আজকের একাদশ। তবে মুস্তাফিজের বদলে পেসার রুবেল এবং মিঠুনের বদলে সাব্বির কিংবা লিটনের কাউকে আজ দেখা যেতে পারে- তথ্যটি অবশ্য ওয়েদার বুলেটিনের মতো মজবুত নয়। পরিস্থিতির বিচার ও পিচ দেখে শেষ মুহূর্তে একাদশে পরিবর্তন করার অধিকার রাখেন অধিনায়ক।

তবে পিচ দেখে খুব একটা পরিস্কার ধারণা গতকালও পাননি মাশরাফি। বৃষ্টির কারণে বেশ অনেকটা সময় সেটা গায়ে জ্যাকেট জড়িয়েই ছিল! মাঠের আকার নিয়ে অবশ্য একটি তথ্য তিনি হাতে পেয়েছেন। কার্ডিফের মতো ব্রিস্টলের এই মাঠটিই আকারে ছোট। তবে সেটা লংঅন আর লংঅফের দিকে নয়, স্কয়ারের দিকে। সেদিন কার্ডিফের ঠাণ্ডা হাওয়া আর মাঠের আকারের কাছে নাকি বিভ্রান্ত ছিল টাইগাররা।

আগের দুই ম্যাচেই অধিনায়ক বলেছিলেন, তিনি রক্ষণকেই আক্রমণ ধরে নামবেন। তবে লংকার বিপক্ষে কিন্তু কৌশলটি থাকবে উল্টো। ফেভারিট বাংলাদেশ নামবে আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই। নুয়ান প্রদীপ না থাকায় লংকার পেস অ্যাটাক অনেকটাই মালিঙ্গা আর লাকমলনির্ভর।

তা ছাড়া লংকান ব্যাটসম্যানরাও এ মুহূর্তে ফর্মে নেই। ওপেনার থিরুমান্নে আর করুনারত্নের জুটি জমছে না। তবে তাদের মিডলঅর্ডার কুশল পেরেরা, কুশল মেন্ডিস, অজন্তা মেন্ডিস মিলিয়ে কিন্তু বেশ অভিজ্ঞ।

তা ছাড়া ম্যাচটি যদি বৃষ্টির কারণে শেষ পর্যন্ত টি২০ আকার ধারণ করে, তাহলে কিন্তু থিসারা-মালিঙ্গায় চোখরাঙাতে পারে লংকা। তাই বৃষ্টি আর মাঠের আকার বিবেচনায় আজকের ম্যাচে একাদশে সাব্বিরের মতো হার্ডহিটারেররও দেখা যেতে পারে। লংকা-বধে আজ তাই শুধু মাঠের কৌশলই নয়, টেবিলওয়ার্কেও টাইগারদের এগিয়ে থাকতে হবে। প্রতিমুহূর্তে ডি/এল মেথডের অঙ্ক কষতে হবে কম্পিউটার অ্যানালিস্টকেও।